ময়মনসিংহ জংশন থেকে কীভাবে হারিয়ে গেল ‘এগারসিন্দুর এক্সপ্রেস’? আজও রয়ে গেছে নানা প্রশ্ন
আশির দশকের শেষভাগে ময়মনসিংহ রেলওয়ে জংশন থেকে বা হয়ে চলাচলকারী আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর মধ্যে এগারসিন্দুর এক্সপ্রেস ছিল অন্যতম জনপ্রিয় ট্রেন। একই সময়ে চালু হয় ময়মনসিংহ–গৌরীপুর–ভৈরব হয়ে খুলনা থেকে চট্টগ্রামগামী প্রাচী–প্রতীচী এক্সপ্রেস, যা সে সময় বাংলাদেশের দীর্ঘতম রেলপথে চলাচলকারী ট্রেনগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ট্রেনটি বন্ধ হয়ে যায়।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৭ সালে এগারসিন্দুর এক্সপ্রেস চালু হয় ময়মনসিংহ থেকে গৌরীপুর, ঈশ্বরগঞ্জ, আঠারবাড়ী, কিশোরগঞ্জ ও ভৈরব হয়ে ঢাকা পর্যন্ত। শুরু থেকেই এটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যাত্রীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃনগর ট্রেন হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। নেত্রকোনা, ঝারিয়া, হাওরাঞ্চল এবং গৌরীপুর জংশন এলাকার বিপুলসংখ্যক যাত্রী এই ট্রেনে ঢাকা ও ভৈরব যাতায়াত করতেন। এছাড়া সিলেট ও চট্টগ্রামগামী যাত্রীরাও ভৈরব পর্যন্ত এই ট্রেন ব্যবহার করতেন।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, প্রথমদিকে ট্রেনটি ময়মনসিংহ থেকে সকাল ৬টায় ছাড়লেও পরে সময়সূচি পরিবর্তন করে ভোর ৪টায় নির্ধারণ করা হয়। এতে যাত্রীসংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে ট্রেনটি ময়মনসিংহ–গৌরীপুর অংশ থেকে বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর গৌরীপুর জংশন থেকে ভোর ৫টায় ট্রেনটি পুনরায় চালুর প্রস্তাব উঠলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এ বিষয়ে স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবের কারণে গৌরীপুর জংশন থেকে ঢাকাগামী এগারসিন্দুর এক্সপ্রেসের গন্তব্য পুনর্বহাল করা সম্ভব হয়নি। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
২০২৫ সালে ঈশ্বরগঞ্জের আঠারবাড়ী এলাকার জনগণ এগারসিন্দুর এক্সপ্রেস পুনরায় আঠারবাড়ী পর্যন্ত চালুর দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। একই সময়ে গৌরীপুর উপজেলার একটি জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ‘পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স’-এর “জিজ্ঞাসা ও মীমাংসা” কার্যক্রমে গৌরীপুর রেলওয়ে জংশনের ইতিহাস, অবকাঠামো ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পরে ঢাকা কমলাপুর থেকে গৌরীপুর জংশন পর্যন্ত লাইভ প্রচারের মাধ্যমে “গৌরীপুর জংশন থেকে এগারসিন্দুর এক্সপ্রেস চাই” শীর্ষক সামাজিক প্রচারণাও পরিচালিত হয়।
আন্দোলনকারীদের দাবি, গৌরীপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে জংশন হওয়া সত্ত্বেও এখান থেকে ঢাকাগামী আন্তঃনগর ট্রেনের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। বর্তমানে জংশনটির ৫ ও ৬ নম্বর রেললাইন সংস্কারের কাজ শুরু হওয়ায় নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে ভবিষ্যতে এখান থেকে আন্তঃনগর ট্রেন পরিচালনার সক্ষমতা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
তাদের প্রস্তাব, কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেসের পাশাপাশি এগারসিন্দুর প্রভাতী ও এগারসিন্দুর গোধূলি নামে দুটি আন্তঃনগর ট্রেন গৌরীপুর রেলওয়ে জংশন থেকে পরিচালনার সম্ভাবনা বাংলাদেশ রেলওয়ের গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। এতে গৌরীপুর, ঈশ্বরগঞ্জ, আঠারবাড়ী, নেত্রকোনা ও আশপাশের অঞ্চলের যাত্রীদের ঢাকা, ভৈরব এবং কিশোরগঞ্জ যাতায়াতে সুবিধা বৃদ্ধি পাবে বলে তারা মনে করেন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, চলমান রেললাইন সংস্কার শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ রেলওয়ে যাত্রীচাহিদা, কারিগরি সক্ষমতা এবং পরিচালনাগত বাস্তবতা মূল্যায়ন করে গৌরীপুর রেলওয়ে জংশন থেকে ঢাকাগামী ‘এগারসিন্দুর’ আন্তঃনগর ট্রেন পুনরায় চালুর বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করবে। দীর্ঘদিনের এই দাবি বাস্তবায়িত হলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রেল যোগাযোগ আরও গতিশীল হবে এবং গৌরীপুর রেলওয়ে জংশনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হবে বলে স্থানীয়দের বিশ্বাস।
এগারসিন্দুর গোধূলি–প্রভাতী ট্রেনের রুট সম্প্রসারণ: মোহনগঞ্জ পর্যন্ত চালুর যৌক্তিক প্রস্তাবঃ-
ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা এগারসিন্দুর গোধূলি আন্তঃনগর ট্রেনটি কিশোরগঞ্জে শেষ না করে মোহনগঞ্জ পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হলে একই রেক ব্যবহার করে বৃহত্তর হাওরাঞ্চলের যাত্রীদের আরও উন্নত রেলসেবা দেওয়া সম্ভব।
বর্তমানে ট্রেনটি প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬:৪৫ মিনিটে ঢাকা রেলওয়ে স্টেশন (কমলাপুর) থেকে ছেড়ে রাত ১০:৪০ মিনিটে কিশোরগঞ্জে পৌঁছায়। এরপর ট্রেনটি প্রায় ৭ ঘণ্টা কিশোরগঞ্জ স্টেশনে অলস অবস্থায় পড়ে থাকে। এই দীর্ঘ বিরতির পরিবর্তে ট্রেনটি কিশোরগঞ্জ থেকে রাতেই মোহনগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা করলে আনুমানিক রাত ১টার মধ্যে মোহনগঞ্জ পৌঁছানো সম্ভব।
মোহনগঞ্জে প্রায় ৩ ঘণ্টা যাত্রাবিরতি দিয়ে ভোর ৪টার দিকে ট্রেনটি এগারসিন্দুর প্রভাতী হিসেবে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করতে পারে। এতে অতিরিক্ত কোনো রেক সংযোজন ছাড়াই বিদ্যমান সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত হবে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মোহনগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলের হাজারো যাত্রী সরাসরি ঢাকার সঙ্গে আন্তঃনগর রেলযোগাযোগের সুবিধা পাবেন। একই সঙ্গে কিশোরগঞ্জ স্টেশনে দীর্ঘ সময় ট্রেন অলস পড়ে থাকারও অবসান ঘটবে। বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য এটি হবে একটি বাস্তবসম্মত, সাশ্রয়ী এবং যাত্রীবান্ধব উদ্যোগ।
যাত্রীসেবা বৃদ্ধি, রেলের সম্পদের কার্যকর ব্যবহার এবং হাওরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে এগারসিন্দুর গোধূলি–প্রভাতী ট্রেন মোহনগঞ্জ পর্যন্ত সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
মুহাম্মদ রায়হান উদ্দিন সরকার
সাংবাদিক, গবেষক, ইতিহাস সন্ধানী
Mohammad Raihan Uddin Sarker 










