Dhaka 1:33 am, Saturday, 18 July 2026

গৌরীপুর রাজবাড়ির সবচেয়ে প্রাচীন ভবন: গৌরীপুর প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের স্বাক্ষী ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

গৌরীপুর রাজবাড়ির সবচেয়ে প্রাচীন ভবন: গৌরীপুর প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের স্বাক্ষী ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ময়মনসিংহের গৌরীপুর রাজবাড়ি শুধু একটি জমিদার প্রাসাদ নয়; এটি উত্তর-পূর্ব বাংলার জমিদারি, প্রশাসনিক ও সামাজিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। রাজবাড়ি প্রাঙ্গণের সবচেয়ে প্রাচীন ভবনটি স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠাতা জমিদার যুগল কিশোর রায় চৌধুরীর নির্মিত মূল আবাসিক ভবন হিসেবে পরিচিত। ইতিহাসবিদদের মতে, এই ভবনই গৌরীপুর এস্টেটের প্রাথমিক প্রশাসনিক, প্রধান কাছারী, কয়েদি ঘর ও আবাসিক কেন্দ্র ছিল এবং পরবর্তী সময়ে পুরো রাজবাড়ি কমপ্লেক্সের বিকাশ এই ভবনকে কেন্দ্র করেই ঘটে।

ঐতিহাসিক বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, বাংলা ১১৭৬ (প্রায় ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দ) সালে জমিদার যুগল কিশোর রায় চৌধুরী মোমেনসিং পরগণায় নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপন করেন এবং এর নাম দেন গৌরীপুর। একই সময় তিনি নিজের আবাস ও জমিদারি পরিচালনার জন্য যে ভবন নির্মাণ করেন, সেটিই বর্তমানে গৌরীপুর রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে সবচেয়ে প্রাচীন স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত।
এই ভবনের গুরুত্ব কেবল স্থাপত্যগত নয়; এটি গৌরীপুর শহরের জন্মেরও নীরব সাক্ষী। এখান থেকেই জমিদারি প্রশাসন পরিচালিত হতো, প্রজাদের বিচারকার্য সম্পন্ন হতো এবং নতুন গড়ে ওঠা শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। পরবর্তীকালে রাজবংশের উত্তরসূরি ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর আমলে নতুন প্রাসাদ, নাট্যমঞ্চ, অতিথিশালা, দিঘি ও অন্যান্য নান্দনিক স্থাপনা নির্মিত হলেও প্রতিষ্ঠাতার নির্মিত মূল ভবনটি গৌরীপুরের ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকে।

স্থাপত্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রাচীন ভবনটির নির্মাণশৈলীতে আঠারো শতকের বাংলার জমিদার বাড়ির বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। পাতলা ইটের দেয়াল, উঁচু ভিত্তি, প্রশস্ত বারান্দা এবং প্রাকৃতিক বায়ু চলাচলের উপযোগী পরিকল্পনা ভবনটির প্রাচীনত্বের পরিচয় বহন করে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অংশে সংস্কার ও সংযোজন করা হলেও মূল কাঠামোর ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যের অনেকাংশ এখনও টিকে আছে।

গৌরীপুর রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠার উৎপত্তির সুস্পষ্ট ইতিহাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার শহরে অবস্থিত ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি অ্যান্ড লাইব্রেরি এবং দি ইলেক্টোরাল কমিটি ফর পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ইতিহাসের অজানা অধ্যায় উন্মোচনের উদ্দেশ্যে সংগঠন দুটি অপ্রকাশিত তথ্য, জনশ্রুতি, প্রবীণ মানুষের স্মৃতিচারণ, প্রাচীন দলিল, মানচিত্র ও স্থানীয় ঐতিহ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে গৌরীপুরের ইতিহাস হালনাগাদ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এসিক এসোসিয়েশনক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশনের সহযোগিতায় প্রতিবছর প্রকাশিত আঞ্চলিক গবেষণাধর্মী ম্যাগাজিন ‘পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স’-এ প্রকাশিত রেনেলের প্রায় আড়াইশ বছর আগের মানচিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তৎকালীন মোমেনসিং পরগণার অন্তর্গত বর্তমান গৌরীপুর উপজেলার স্থানে বোকাইনগর, সরিষাহাটি এবং বাশাটি নামের জনপদের উল্লেখ রয়েছে। তবে সেখানে ‘গৌরীপুর’ নামটি পাওয়া যায় না। গবেষকদের মতে, এ থেকে ধারণা করা যায় যে গৌরীপুর নামক জনপদ বা এস্টেট তখনও প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল অথবা পরবর্তীকালে এই নামে পরিচিতি লাভ করে। বর্তমানে বোকাইনগর গৌরীপুর উপজেলার একটি ইউনিয়ন এবং সরিষাহাটিবাশাটি দুটি গ্রামের নাম হিসেবে বিদ্যমান।

রামগোপালপুর জমিদার পরিবারের সদস্য ও ইতিহাসবিদ শৌরীন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী তাঁর ১৯১১ সালে প্রকাশিত “ময়মনসিংহের বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ জমিদার” গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরীর বংশলতিকা বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। শৌরীন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর ১৯১১ সালের বংশলতিকায় যুগল কিশোর রায় চৌধুরীকে কৃষ্ণগোপাল রায় চৌধুরীর দত্তক উত্তরাধিকারী হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, দত্তক গ্রহণের পূর্বে তাঁর নাম কী ছিল—সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। অথচ একই বংশলতিকায় পরবর্তী দত্তক উত্তরাধিকারী আনন্দ কিশোর রায় চৌধুরীর পূর্ব নাম ঈশ্বরচন্দ্র চৌধুরী এবং ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর পূর্ব নাম রজনীপ্রসাদ ভট্টাচার্য হিসেবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। ফলে যুগল কিশোরের পূর্ব নাম সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।

গৌরীপুর রাজবাড়ির ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন মত তৈরি করা হয়েছিল। বিশেষ করে যুগল কিশোর রায় চৌধুরীর বংশপরিচয় নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, তিনি গৌরীপুর এস্টেটের প্রতিষ্ঠাতা এবং ১৭৭০ সালের দিকে গৌরীপুরকে প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন—এ বিষয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় গবেষণার বিষয় হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত। আজ প্রায় আড়াই শতাব্দী পরও গৌরীপুর মহিলা ডিগ্রি (অনার্স )কলেজে অবস্থিত এই প্রাচীন ভবনটি গৌরীপুরের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। যথাযথ প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ, সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে ভবনটিকে জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব। ইতিহাসবিদদের মতে, এই ভবন সংরক্ষিত হলে গৌরীপুরের প্রতিষ্ঠাকাল, জমিদারি প্রশাসন এবং উত্তর-পূর্ব বাংলার সামাজিক ইতিহাস সম্পর্কে ভবিষ্যৎ গবেষণা আরও সমৃদ্ধ হবে।

গৌরীপুরের ইতিহাস সংরক্ষণ আজ শুধু একটি স্থাপনা রক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি একটি জনপদের জন্ম, বিকাশ এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব।

তথ্য সূত্র:

১. ময়মনসিংহের বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ জমিদার— শ্রী শৌরীন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী (রামগোপালপুর এস্টেট এর জমিদার ও রাজা যোগেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর ৩য় পুত্র)

২. ময়মনসিংহের ইতিহাস ও ময়মনসিংহের বিবরণ— শ্রী কেদারনাথ মজুমদার

৩. ময়মনসিংহের জমিদারি ও ভূমিস্বত্ব— মো. হাফিজুর রহমান ভূঞা

৪. ব্রিটিশ ভূবিদ মেজর জেমস রেনেলের অংকিত কয়েকটি মানচিত্র

৫. সিরাজের পুত্র ও বংশধরদের সন্ধানে— ভারত উপমহাদেশের অন্যতম কৃতি ইতিহাসবিদ ও প্রফেসর ড. অমলেন্দু দে

৬. নেত্রকোণা জেলার ইতিহাস— আলী আহম্মদ খান আইয়োব

৭. উইকিপিডিয়ার তথ্য  (৮) বাংলাপিডিয়ার তথ্য  (৯) ম্যাগাজিন: পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স-২০২০, পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স-২০২১ ও ২০২২ , পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স ২০২৩ এরং পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স-২০২৪ ও ২০২৫

(১০) ইতিহাস অনুসন্ধানী সংগঠন কর্তৃক প্রতিবেদনে সহযোগিতা (এসিক এসোসিয়েশন, ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন, দি ইলেক্টোরাল কমিটি ফর পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স, ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি এন্ড লাইব্রেরি, ক্রিয়েটিভ সন্ধানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্লাব ) (১১) ময়মনসিংহ অঞ্চলের ঐতিহাসিক নিদর্শন – দরজি আবদুল ওয়াহাব (১২) ময়মনসিংহের রাজপরিবার – আবদুর রশীদ। (13) A Description Of The Roads In Bengal And Bahar and A General Map of the Roads in Bengal (14) The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204-1760- Richard M. Eaton (15) The History of British India- James Mill (16) The history of two forts in Gouripur, Mymensingh-Mohammad Raihan Uddin Sarker (Special issue on 38th anniversary of the New Nation, published on 19 June 2017). (17) David Rumsey Historical Map Collection. (18) New York Historical Society. (19) ১৯১৭ সালে F. A. Sachse এর সম্পাদিত Bengal District Gazetteers’ Mymensingh (20) ১৯০৫ সালে প্রকাশিত MYMENSINGH DISTRICT GAZETTEER. STATISTICS, 1901-02.

লেখক: মুহাম্মদ রায়হান উদ্দিন সরকার

সাংবাদিক, গবেষক ও ইতিহাস সন্ধানী

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

Popular Post

গৌরীপুর রাজবাড়ির সবচেয়ে প্রাচীন ভবন: গৌরীপুর প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের স্বাক্ষী ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

গৌরীপুর রাজবাড়ির সবচেয়ে প্রাচীন ভবন: গৌরীপুর প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের স্বাক্ষী ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

Update Time : 01:23:43 am, Thursday, 16 July 2026

গৌরীপুর রাজবাড়ির সবচেয়ে প্রাচীন ভবন: গৌরীপুর প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের স্বাক্ষী ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ময়মনসিংহের গৌরীপুর রাজবাড়ি শুধু একটি জমিদার প্রাসাদ নয়; এটি উত্তর-পূর্ব বাংলার জমিদারি, প্রশাসনিক ও সামাজিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। রাজবাড়ি প্রাঙ্গণের সবচেয়ে প্রাচীন ভবনটি স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠাতা জমিদার যুগল কিশোর রায় চৌধুরীর নির্মিত মূল আবাসিক ভবন হিসেবে পরিচিত। ইতিহাসবিদদের মতে, এই ভবনই গৌরীপুর এস্টেটের প্রাথমিক প্রশাসনিক, প্রধান কাছারী, কয়েদি ঘর ও আবাসিক কেন্দ্র ছিল এবং পরবর্তী সময়ে পুরো রাজবাড়ি কমপ্লেক্সের বিকাশ এই ভবনকে কেন্দ্র করেই ঘটে।

ঐতিহাসিক বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, বাংলা ১১৭৬ (প্রায় ১৭৭০ খ্রিস্টাব্দ) সালে জমিদার যুগল কিশোর রায় চৌধুরী মোমেনসিং পরগণায় নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র স্থাপন করেন এবং এর নাম দেন গৌরীপুর। একই সময় তিনি নিজের আবাস ও জমিদারি পরিচালনার জন্য যে ভবন নির্মাণ করেন, সেটিই বর্তমানে গৌরীপুর রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে সবচেয়ে প্রাচীন স্থাপনা হিসেবে বিবেচিত।
এই ভবনের গুরুত্ব কেবল স্থাপত্যগত নয়; এটি গৌরীপুর শহরের জন্মেরও নীরব সাক্ষী। এখান থেকেই জমিদারি প্রশাসন পরিচালিত হতো, প্রজাদের বিচারকার্য সম্পন্ন হতো এবং নতুন গড়ে ওঠা শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। পরবর্তীকালে রাজবংশের উত্তরসূরি ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর আমলে নতুন প্রাসাদ, নাট্যমঞ্চ, অতিথিশালা, দিঘি ও অন্যান্য নান্দনিক স্থাপনা নির্মিত হলেও প্রতিষ্ঠাতার নির্মিত মূল ভবনটি গৌরীপুরের ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকে।

স্থাপত্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রাচীন ভবনটির নির্মাণশৈলীতে আঠারো শতকের বাংলার জমিদার বাড়ির বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যায়। পাতলা ইটের দেয়াল, উঁচু ভিত্তি, প্রশস্ত বারান্দা এবং প্রাকৃতিক বায়ু চলাচলের উপযোগী পরিকল্পনা ভবনটির প্রাচীনত্বের পরিচয় বহন করে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অংশে সংস্কার ও সংযোজন করা হলেও মূল কাঠামোর ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যের অনেকাংশ এখনও টিকে আছে।

গৌরীপুর রাজবাড়ির প্রতিষ্ঠার উৎপত্তির সুস্পষ্ট ইতিহাস অনুসন্ধানের লক্ষ্যে ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার শহরে অবস্থিত ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি অ্যান্ড লাইব্রেরি এবং দি ইলেক্টোরাল কমিটি ফর পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ইতিহাসের অজানা অধ্যায় উন্মোচনের উদ্দেশ্যে সংগঠন দুটি অপ্রকাশিত তথ্য, জনশ্রুতি, প্রবীণ মানুষের স্মৃতিচারণ, প্রাচীন দলিল, মানচিত্র ও স্থানীয় ঐতিহ্য সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণের মাধ্যমে গৌরীপুরের ইতিহাস হালনাগাদ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এসিক এসোসিয়েশনক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশনের সহযোগিতায় প্রতিবছর প্রকাশিত আঞ্চলিক গবেষণাধর্মী ম্যাগাজিন ‘পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স’-এ প্রকাশিত রেনেলের প্রায় আড়াইশ বছর আগের মানচিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তৎকালীন মোমেনসিং পরগণার অন্তর্গত বর্তমান গৌরীপুর উপজেলার স্থানে বোকাইনগর, সরিষাহাটি এবং বাশাটি নামের জনপদের উল্লেখ রয়েছে। তবে সেখানে ‘গৌরীপুর’ নামটি পাওয়া যায় না। গবেষকদের মতে, এ থেকে ধারণা করা যায় যে গৌরীপুর নামক জনপদ বা এস্টেট তখনও প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল অথবা পরবর্তীকালে এই নামে পরিচিতি লাভ করে। বর্তমানে বোকাইনগর গৌরীপুর উপজেলার একটি ইউনিয়ন এবং সরিষাহাটিবাশাটি দুটি গ্রামের নাম হিসেবে বিদ্যমান।

রামগোপালপুর জমিদার পরিবারের সদস্য ও ইতিহাসবিদ শৌরীন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী তাঁর ১৯১১ সালে প্রকাশিত “ময়মনসিংহের বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ জমিদার” গ্রন্থে শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরীর বংশলতিকা বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। শৌরীন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর ১৯১১ সালের বংশলতিকায় যুগল কিশোর রায় চৌধুরীকে কৃষ্ণগোপাল রায় চৌধুরীর দত্তক উত্তরাধিকারী হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, দত্তক গ্রহণের পূর্বে তাঁর নাম কী ছিল—সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। অথচ একই বংশলতিকায় পরবর্তী দত্তক উত্তরাধিকারী আনন্দ কিশোর রায় চৌধুরীর পূর্ব নাম ঈশ্বরচন্দ্র চৌধুরী এবং ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর পূর্ব নাম রজনীপ্রসাদ ভট্টাচার্য হিসেবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। ফলে যুগল কিশোরের পূর্ব নাম সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।

গৌরীপুর রাজবাড়ির ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন মত তৈরি করা হয়েছিল। বিশেষ করে যুগল কিশোর রায় চৌধুরীর বংশপরিচয় নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, তিনি গৌরীপুর এস্টেটের প্রতিষ্ঠাতা এবং ১৭৭০ সালের দিকে গৌরীপুরকে প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন—এ বিষয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয় গবেষণার বিষয় হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত। আজ প্রায় আড়াই শতাব্দী পরও গৌরীপুর মহিলা ডিগ্রি (অনার্স )কলেজে অবস্থিত এই প্রাচীন ভবনটি গৌরীপুরের প্রতিষ্ঠার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। যথাযথ প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ, সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে ভবনটিকে জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরা সম্ভব। ইতিহাসবিদদের মতে, এই ভবন সংরক্ষিত হলে গৌরীপুরের প্রতিষ্ঠাকাল, জমিদারি প্রশাসন এবং উত্তর-পূর্ব বাংলার সামাজিক ইতিহাস সম্পর্কে ভবিষ্যৎ গবেষণা আরও সমৃদ্ধ হবে।

গৌরীপুরের ইতিহাস সংরক্ষণ আজ শুধু একটি স্থাপনা রক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি একটি জনপদের জন্ম, বিকাশ এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব।

তথ্য সূত্র:

১. ময়মনসিংহের বারেন্দ্র ব্রাহ্মণ জমিদার— শ্রী শৌরীন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী (রামগোপালপুর এস্টেট এর জমিদার ও রাজা যোগেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর ৩য় পুত্র)

২. ময়মনসিংহের ইতিহাস ও ময়মনসিংহের বিবরণ— শ্রী কেদারনাথ মজুমদার

৩. ময়মনসিংহের জমিদারি ও ভূমিস্বত্ব— মো. হাফিজুর রহমান ভূঞা

৪. ব্রিটিশ ভূবিদ মেজর জেমস রেনেলের অংকিত কয়েকটি মানচিত্র

৫. সিরাজের পুত্র ও বংশধরদের সন্ধানে— ভারত উপমহাদেশের অন্যতম কৃতি ইতিহাসবিদ ও প্রফেসর ড. অমলেন্দু দে

৬. নেত্রকোণা জেলার ইতিহাস— আলী আহম্মদ খান আইয়োব

৭. উইকিপিডিয়ার তথ্য  (৮) বাংলাপিডিয়ার তথ্য  (৯) ম্যাগাজিন: পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স-২০২০, পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স-২০২১ ও ২০২২ , পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স ২০২৩ এরং পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স-২০২৪ ও ২০২৫

(১০) ইতিহাস অনুসন্ধানী সংগঠন কর্তৃক প্রতিবেদনে সহযোগিতা (এসিক এসোসিয়েশন, ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন, দি ইলেক্টোরাল কমিটি ফর পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স, ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি এন্ড লাইব্রেরি, ক্রিয়েটিভ সন্ধানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্লাব ) (১১) ময়মনসিংহ অঞ্চলের ঐতিহাসিক নিদর্শন – দরজি আবদুল ওয়াহাব (১২) ময়মনসিংহের রাজপরিবার – আবদুর রশীদ। (13) A Description Of The Roads In Bengal And Bahar and A General Map of the Roads in Bengal (14) The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204-1760- Richard M. Eaton (15) The History of British India- James Mill (16) The history of two forts in Gouripur, Mymensingh-Mohammad Raihan Uddin Sarker (Special issue on 38th anniversary of the New Nation, published on 19 June 2017). (17) David Rumsey Historical Map Collection. (18) New York Historical Society. (19) ১৯১৭ সালে F. A. Sachse এর সম্পাদিত Bengal District Gazetteers’ Mymensingh (20) ১৯০৫ সালে প্রকাশিত MYMENSINGH DISTRICT GAZETTEER. STATISTICS, 1901-02.

লেখক: মুহাম্মদ রায়হান উদ্দিন সরকার

সাংবাদিক, গবেষক ও ইতিহাস সন্ধানী