ময়মনসিংহ–গৌরীপুর থেকে কেন হারিয়ে গেল এগারসিন্দুর এক্সপ্রেস? উত্তর খুঁজছে উত্তর-পূর্বাঞ্চল
একসময় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের কাছে ঢাকায় যাতায়াতের অন্যতম নির্ভরতার নাম ছিল এগারসিন্দুর এক্সপ্রেস। ১৯৮৭ সালে চালু হওয়া এই আন্তঃনগর ট্রেনটি ময়মনসিংহ, গৌরীপুর, ঈশ্বরগঞ্জ, আঠারবাড়ী, কিশোরগঞ্জ ও ভৈরব হয়ে রাজধানীর সঙ্গে বিস্তীর্ণ জনপদের যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশকের শেষদিকে ময়মনসিংহ–গৌরীপুর অংশ থেকে ট্রেনটির চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কেন এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে জনসমক্ষে আসেনি।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা, রেলযাত্রী ও সাবেক রেলকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শুরুতে ট্রেনটি সকাল ৬টায় ময়মনসিংহ থেকে ছাড়ত। পরে সময়সূচি পরিবর্তন করে ভোর ৪টায় নির্ধারণ করা হলে যাত্রীসংখ্যা কমে যায়। এরপর ধীরে ধীরে এই রুটে ট্রেনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে শুধু যাত্রীসংখ্যা কমে যাওয়াই কি একমাত্র কারণ ছিল, নাকি এর পেছনে পরিচালনাগত, অর্থনৈতিক বা অন্য কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত কাজ করেছে—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অস্পষ্ট।
এখানেই তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। একটি আন্তঃনগর ট্রেনের রুট পরিবর্তন বা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে সাধারণত যাত্রীচাহিদা, আয়-ব্যয়, অবকাঠামো, পরিচালন সক্ষমতা এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের লিখিত ভিত্তি থাকে। তাহলে এগারসিন্দুর এক্সপ্রেসের ক্ষেত্রে সেই নথিপত্র কোথায়? সিদ্ধান্তের কারণ কী ছিল? সেই সিদ্ধান্ত আজও কার্যকর রাখার যৌক্তিকতা কী? জনস্বার্থে এসব প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছ থেকেই আসা উচিত।
২০২৫ সালে ঈশ্বরগঞ্জের আঠারবাড়ী এলাকায় ট্রেনটি পুনরায় চালুর দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। একই সময়ে গৌরীপুরের এসিক এসোসিয়েশন, ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও গবেষণামূলক সংগঠন গৌরীপুর রেলওয়ে জংশনের ইতিহাস, অবকাঠামো ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও “গৌরীপুর জংশন থেকে এগারসিন্দুর এক্সপ্রেস চাই” শীর্ষক প্রচারণা উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন পায়।
গৌরীপুর একটি গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে জংশন। এখান থেকে নেত্রকোনা, মোহনগঞ্জ, শ্যামগঞ্জ, ময়মনসিংহ, কিশোরগঞ্জ ও ভৈরবমুখী রেলপথ সংযুক্ত। সাম্প্রতিক সময়ে জংশনের ৫ ও ৬ নম্বর রেললাইন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা পরিচালন সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—বর্তমান অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রেক্ষাপটে গৌরীপুর থেকে আন্তঃনগর ট্রেন পুনরায় চালুর সম্ভাবনা কি নতুন করে মূল্যায়ন করা উচিত নয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যমান সম্পদের দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করেও নতুন সেবা চালুর সুযোগ থাকতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা হচ্ছে, বর্তমানে ঢাকা থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটে ছেড়ে কিশোরগঞ্জে রাত ১০টা ৪০ মিনিটে পৌঁছানো এগারসিন্দুর গোধূলি ট্রেনের রেক দীর্ঘ সময় অলস থাকে। যথাযথ সময়সূচি, সিগন্যালিং এবং পরিচালন সক্ষমতা যাচাই করে একই রেক মোহনগঞ্জ পর্যন্ত পরিচালনা এবং ভোরে এগারসিন্দুর প্রভাতী হিসেবে ঢাকায় ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা নিয়ে সমীক্ষা করা যেতে পারে। এতে অতিরিক্ত রেক ছাড়াই সেবা সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
তবে এ ধরনের কোনো প্রস্তাব বাস্তবায়নের আগে যাত্রীচাহিদা, রেলপথের ধারণক্ষমতা, পরিচালন ব্যয়, নিরাপত্তা, সময়সূচির সমন্বয় এবং আর্থিক সম্ভাব্যতা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কারিগরি ও অর্থনৈতিক সমীক্ষা অপরিহার্য। তথ্য-উপাত্তভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমেই সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত।
আজ প্রশ্ন একটাই—উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষের বহু বছরের দাবি কি নতুন করে বিবেচনা করা হবে? গৌরীপুর, ঈশ্বরগঞ্জ, আঠারবাড়ী, নান্দাইল, নেত্রকোনা ও বৃহত্তর হাওরাঞ্চলের মানুষের যোগাযোগের স্বার্থে বাংলাদেশ রেলওয়ে কি অতীতের সিদ্ধান্ত পুনর্মূল্যায়ন করবে?
একটি বিষয় স্পষ্ট—এগারসিন্দুর এক্সপ্রেস পুনরায় চালুর দাবি কেবল একটি ট্রেনের দাবি নয়। এটি আঞ্চলিক ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়ন, ন্যায্য যোগাযোগ সুবিধা এবং রাষ্ট্রের বিদ্যমান রেলসম্পদের কার্যকর ব্যবহারের প্রশ্ন। তাই অতীতের সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশ, প্রয়োজনীয় সমীক্ষা পরিচালনা এবং জনস্বার্থে একটি স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
Mohammad Raihan Uddin Sarker 









