নিজস্ব প্রতিবেদক:
যেখানে একসময় ছিল শুধু বালির ঢিবি আর অনাবাদি চরভূমি, সেখানে এখন চোখজুড়ানো সবুজের সমারোহ। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ভাটি কাপাসিয়া ও বাদামের চর এলাকায় এবার বাম্পার ফলন হয়েছে তরমুজের। চরাঞ্চলের বালুচরে এই সাফল্য শুধু কৃষিতে নয়, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকায়ও এনেছে আশাব্যঞ্জক পরিবর্তন।
চরাঞ্চলের কৃষকরা জানান, আশ্বিন মাসে বালুচরে বিশেষ পদ্ধতিতে তরমুজের বীজ বপন করা হয়। এরপর দীর্ঘ কয়েক মাস নিবিড় পরিচর্যার পর চৈত্র মাসে তারা ঘরে তুলছেন রসালো ও মিষ্টি এই ফল। উপজেলা কৃষি বিভাগের সার্বিক সহযোগিতা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে।
দীর্ঘদিনের পতিত বালুচরে এমন ফলন দেখে কৃষকদের মুখে এখন তৃপ্তির হাসি। শুধু ফলনই নয়, তরমুজ চাষ তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। কৃষকদের দাবি, সার, কীটনাশক ও পরিচর্যার সব খরচ বাদ দিয়েও প্রতি বিঘা জমি থেকে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট লাভ হচ্ছে। ফলে একসময় অবহেলিত ও অনাবাদি থাকা চরভূমি এখন পরিণত হয়েছে আয়ের নির্ভরযোগ্য উৎসে।
ভাটি কাপাসিয়া গ্রামের কৃষক রাজা মিয়া বলেন,
“চরাঞ্চলের মানুষের জন্য তরমুজ চাষ একেবারেই নতুন একটি বিষয়। তবে ফলন ভালো হওয়ায় দিন দিন মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। এখন অনেকেই এই চাষে এগিয়ে আসছেন।”
একই গ্রামের আরেক কৃষক আলী আজগর মণ্ডল বলেন,
“বালুর চরে যে এত সুন্দর তরমুজ চাষ হতে পারে, তা দেখতে এখন বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসছে।
আগে কখনো ভাবিনি, এই বালুচরই আমাদের আয়ের বড় উৎস হয়ে উঠবে।” কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বালুচরে সাধারণ পদ্ধতিতে চাষাবাদ খুব একটা সম্ভব নয়। তাই কৃষকরা এখানে ব্যবহার করছেন বিশেষ মালচিং পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে জমি পলিথিন বা শুকনো পাতা দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়, যা বালির অতিরিক্ত উত্তাপ কমায় এবং মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করে। পাশাপাশি ড্রিপ ইরিগেশন পদ্ধতিতে পানি সরবরাহ করায় কম পানি ব্যবহার করেও ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে।
সুন্দরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন,
“চরাঞ্চলে কৃষি সম্প্রসারণে আমরা সব সময় কৃষকদের পাশে আছি। তরমুজ চাষে তাদের উদ্বুদ্ধ করতে প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এ সাফল্য দেখে আগামী মৌসুমে আরও অনেক কৃষক তরমুজ চাষে আগ্রহী হবেন বলে আমরা আশা করছি।”
স্থানীয়রা মনে করছেন, চরাঞ্চলের এই কৃষি সম্ভাবনাকে আরও এগিয়ে নিতে হলে প্রয়োজন সরকারি সহায়তা। সহজ শর্তে কৃষিঋণ, কৃষি উপকরণে ভর্তুকি এবং উৎপাদিত ফসলের সুষ্ঠু বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা গেলে চরাঞ্চলের কৃষকরা আরও বেশি লাভবান হবেন।
এদিকে, সুন্দরগঞ্জে তরমুজ চাষের এই সাফল্য এখন আশপাশের উপজেলাগুলোতেও আগ্রহ তৈরি করেছে। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, আগামী মৌসুমে এ এলাকায় তরমুজ চাষের পরিধি আরও বাড়বে। শুধু তরমুজই নয়, একই পদ্ধতিতে বালুচরে পেঁপে, মরিচ ও অন্যান্য সবজি চাষেরও পরিকল্পনা করছেন কৃষকরা।
একসময় যে তিস্তার বালুচর ছিল অনাবাদি ও উপেক্ষিত, আজ সেখানেই ফুটে উঠেছে সম্ভাবনার নতুন স্বপ্ন। কৃষকদের উদ্যোগ, পরিশ্রম এবং কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় চরাঞ্চলের বালুচর এখন আর শুধু বালুর স্তূপ নয়—এখন তা সম্ভাবনা, উৎপাদন ও স্বাবলম্বিতার আরেক নাম।
Reporter Name 












