হযরত শাহ্ছুফী (রঃ)-এর মাজার: ইতিহাস ও ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট
ময়মনসিংহ জেলার গৌরীপুর উপজেলার শাহগঞ্জ বাজারে অবস্থিত মধ্যযুগের এক আধ্যাত্মিক নিদর্শন হযরত শাহ্ছুফী (রঃ)-এর মাজার। গবেষক ও ইতিহাস সন্ধানীদের মতে, এই মাজারকে কেন্দ্র করেই এলাকাটির নামকরণ হয়েছে “শাহগঞ্জ”।
মাজারের পরিচিতি ও কালপঞ্জি
মাজারটির সঠিক বয়স বা সময়কাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো লিখিত দলিল বা সন তারিখ পাওয়া না গেলেও জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিক মতবাদ অনুযায়ী এটি মধ্যযুগের একটি মাজার। মাজারের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক সংযোগ নিয়ে প্রধানত দুটি জনশ্রুতি প্রচলিত রয়েছে:
শাহ সুলতানের সফরসঙ্গী: অনেকের মতে, মদনপুরে আগত হযরত শাহ সুলতানের সফরসঙ্গীদের মধ্যে তিনি একজন ছিলেন।
হযরত শাহজালালের সফরসঙ্গী: আবার কেউ কেউ মনে করেন, হযরত শাহজালাল (রঃ)-এর সাথে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে যে আউলিয়াগণ সিলেটে ও এর আশেপাশের অঞ্চলে এসেছিলেন, এই শাহ্ছুফী (রঃ) তাঁদেরই একজন সফরসঙ্গী হতে পারেন।
ভৌগোলিক অবস্থান ও নদীমাতৃক প্রেক্ষাপট
মধ্য যুগের মাজারের উৎপত্তির সুস্পষ্ট ইতিহাস তুলে ধরার লক্ষ্যে ময়মনসিংহের গৌরীপুরে অবস্থিত ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশন হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি অ্যান্ড লাইব্রেরি এবং দি ইলেক্টোরাল কমিটি ফর পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স নামে সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে। ইতিহাসের অজানা অধ্যায় উন্মোচনের উদ্দেশ্যে সংগঠনগুলো অপ্রকাশিত তথ্য, জনশ্রুতি, প্রবীণ মানুষের স্মৃতিচারণ, ঝরে পড়া ইতিহাস, প্রাচীন দুর্লভ দলিল এবং মানচিত্র সংগ্রহ ও গবেষণার মাধ্যমে ইতিহাসকে হালনাগাদ করার কাজ পরিচালনা করছে। প্রামাণ্য দলিল হিসেবে এসিক এসোসিয়েশন ও ক্রিয়েটিভ এসোসিয়েশনের সহযোগিতায় প্রতিবছর প্রকাশিত হয় আঞ্চলিক তথ্যবহুল স্বনামধন্য ম্যাগাজিন ‘পেন অ্যাওয়ার্ড অ্যাফেয়ার্স’। এ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত প্রায় আড়াইশ বছর আগের রেনেলের মানচিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জেমস রেনেলের অঙ্কিত ঐতিহাসিক মানচিত্র ও এলাকার ভূ-প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে শাহগঞ্জ এলাকার প্রাচীন নদীমাতৃক রূপটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অতীতে এই অঞ্চলে বেশ কিছু প্রবহমান ও শাখা নদী জালের মতো ছড়িয়ে ছিল:
শ্যামগঞ্জ থেকে উৎপত্তি হয়ে সোয়াই নদীর সাথে সংযুক্ত হয়ে গৌরীপুরের পূর্ব দিক দিয়ে শাহগঞ্জ হয়ে সুরিয়া নদীর সাথে মিলিত হয়েছিল এই বিশাল নদীটি। সুরিয়া নদী পরবর্তীতে বুরুঙ্গা নদীর সাথে একত্র হয়ে সোজা জঙ্গলবাড়ির সাথে মিলিত হতো। বোকাইনগর থেকে কেল্লার দিকেও একটি শাখা নদী প্রবাহিত ছিল।
উঁচু মাজার ও নামকরণের পেছনের জনশ্রুতি
প্লাবণ থেকে সুরক্ষার ইতিহাস: মাজারটি আশেপাশের এলাকার তুলনায় কিছুটা উঁচুতে অবস্থিত। এর মূল কারণ হলো, প্রাচীনকালে এই অঞ্চলটি প্রায়ই বন্যায় প্লাবিত হতো। ইসলাম প্রচারের সময় পানির হাত থেকে রক্ষা পেতে তাঁর শিষ্যরা উঁচু স্থানে আস্তানা তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীতে সেই আস্তানা থেকেই ধীরে ধীরে এটি পবিত্র মাজারে রূপ নেয়।
পাঁচকাহনিয়া গ্রামের ইতিহাস: শাহগঞ্জ সংলগ্ন তাজপুরের সামনে “পাঁচকাহনিয়া” নামের একটি গ্রাম রয়েছে। জনশ্রুতি রয়েছে যে, প্রাচীনকালে এই নদী পারাপারের জন্য পাঁচ কাহন ফি বা শুল্ক দিতে হতো, যা থেকে পরবর্তীতে এই অঞ্চলের নামকরণ হয়েছে।
১নং খাস জমি: শাহগঞ্জ এলাকার বিভিন্ন খাস জমি হিসেবে পরিচিত স্থানগুলোর মধ্যে বর্তমান শাহগঞ্জ কলেজসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও এলাকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই মাজার এবং এর চারপাশের জনশ্রুতি ও ভৌগোলিক ইতিহাসের শিকড় প্রোথিত রয়েছে এই জনপদের বহু পুরোনো ঐতিহ্য ও ইসলাম প্রচারের ইতিহাসের সাথে।
Mohammad Raihan Uddin Sarker 



















